নিউটনের গতিসূত্রসমূহ

নিউটনের গতির সূত্রসমূহ বলতে প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের তিনটি সূত্রকে বোঝায় যা কোনো বস্তুর উপর কার্যরত বলের সাথে বস্তুর গতির সম্পর্ককে বর্ণনা করে। নিউটনীয় বলবিদ্যার ভিত্তি স্থাপনকারী এই সূত্র তিনটিকে পদার্থবিজ্ঞানের আধুনিক পরিভাষায় নিম্নরূপে বিবৃত করা যায়:
- বাহ্যিক বল প্রয়োগে বস্তুর অবস্থা পরিবর্তন করতে বাধ্য না করলে স্থির বস্তু স্থিরই থাকবে এবং গতিশীল বস্তু সমদ্রুতিতে সরলরৈখিক পথে (অর্থাৎ সমবেগে) চলতে থাকবে।
- বস্তুর ভরবেগের পরিবর্তনের হার তার ওপর প্রযুক্ত বলের সমানুপাতিক এবং বল যেদিকে ক্রিয়া করে বন্ধুর ভরবেগের পরিবর্তনও সেদিকে ঘটে। অথবা, যে কোনো বিশেষ মুহূর্তে কোনো বস্তুর উপর প্রযুক্ত নীট বল বস্তুটির ভর ও ত্বরণের গুণফলের সমান।
- প্রত্যেক ক্রিয়ারই একটি সমান ও বিপরীতমুখী প্রতিক্রিয়া আছে। অথবা, দুটি বস্তু যখন একে অন্যের উপর বল প্রয়োগ করে, তখন বল দুটির মান সমান কিন্তু দিক পরস্পর বিপরীত হয়।[১][২]
ব্রিটিশ পদার্থবিদ, গনিতজ্ঞ ও আলকেমিবিদ আইজাক নিউটন তার ১৬৮৭ সালে প্রকাশিত Philosophiæ Naturalis Principia Mathematica (প্রাকৃতিক দর্শনের গাণিতিক নীতিসমূহ) গ্রন্থে গতির সূত্র তিনটি বর্ণনা করেন।[৩] নিউটন বিভিন্ন প্রাকৃতিক বস্তু এবং ব্যবস্থার গতির কার্যকারণ অনুসন্ধান ও ব্যাখ্যা করার জন্য এই সূত্রগুলো ব্যবহার করতেন। নিউটনের পরবর্তী সময়ে তার সূত্রাবলীর উপর ভিত্তি করে তার সাথে নতুন কিছু ধারণা (বিশেষ করে শক্তির ধারণা) সমন্বয়ে চিরায়ত বলবিজ্ঞান প্রতিষ্ঠা পায়। তবে নিউটনের সূত্রগুলির সীমাবদ্ধতাও আবিষ্কৃত হয়েছে: অত্যন্ত উচ্চ বেগে গতিশীল বস্তু, অত্যন্ত অধিক ভরের বস্তু, অথবা অত্যন্ত ক্ষুদ্র কণার গতিবিধি বর্ণনার ক্ষেত্রে নিউটনীয় বলবিদ্যা অচল হয়ে পড়ে ও নতুন তত্ত্ব (যথাক্রমে বিশেষ ও সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব এবং কোয়ান্টাম বলবিদ্যা) প্রয়োজন হয়।
প্রয়োজনীয় পূর্বজ্ঞান

সূর্য ও পৃথিবী উভয়কেই বিন্দু বস্তু বা বস্তুকণা হিসেবে বিবেচনা করা যায়, কারণ এদের মধ্যবর্তী দূরত্বের তুলনায় এদের ব্যাসার্ধ নগণ্য।
নিউটনের সূত্রগুলি প্রয়োগের ক্ষেত্রে বস্তুকে সাধারণত একটি বিন্দুর ন্যায় "বিন্দু বস্তু" (টেমপ্লেট:Lang-en) বা "বিন্দু ভর" (টেমপ্লেট:Lang-en) অর্থাৎ "বস্তুকণা" হিসেবে বিবেচনা করা হয়। অর্থাৎ বস্তুটির আয়তন নগণ্য ধরে নেয়া হয়। বিষয়টি বাস্তবসম্মত যখন বস্তুর অভ্যন্তরে এর অংশগুলির নিজস্ব কোনো গতি না থাকে বা একাধিক বস্তুর মধ্যে দূরত্ব খুব বেশি হয়। উদাহরণস্বরূপ, পৃথিবী এবং সূর্য উভয়কেই বিন্দু বস্তু বিবেচনা করা যায়, কারণ পৃথিবীর কক্ষপথ থেকে সূর্যের দূরত্ব খুব বেশি। কিন্তু পৃথিবীর উপরে থাকা কোনো বস্তুর জন্য পৃথিবীকে বিন্দুবস্তু মনে করা সঙ্গত নয়।টেমপ্লেট:Refn

বস্তুর গতিকে গাণিতিকভাবে বর্ণনার জন্য সৃতিবিদ্যা (Kinematics) এর ধারণা প্রয়োজন। সৃতিবিদ্যার মৌলিক বিষয়টি হলো এই যে, কিছু সংখ্যাসূচক মান (স্থানাঙ্ক) ব্যবহার করে একটি বস্তুর অবস্থান নির্দিষ্ট করা যায়। আবার গতিশীল বস্তুর ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন সময়ে স্থানাঙ্ক ভিন্ন ভিন্ন মান লাভ করে। গাণিতিকভাবে বললে, অবস্থান (বা স্থানাঙ্ক) সময়ের আপেক্ষক বা ফাংশন। এই ফাংশন থেকে সময়ের প্রতিটি মানের জন্য সবগুলো স্থানাঙ্কের পরিবর্তনশীল মান পাওয়া যায়, যা বস্তুর গতিপথ (টেমপ্লেট:Lang-en) নির্দেশ করে।

এর সবচেয়ে সরল উদাহরণটি একমাত্রিক, অর্থাৎ যখন কোনো বস্তুর গতি একটি সরলরেখা বরাবর সীমাবদ্ধ থাকে। এক্ষেত্রে বস্তুর অবস্থান একটি মূলবিন্দুর সাপেক্ষে একটিমাত্র সংখ্যা (একটি স্থানাঙ্ক) দিয়ে নির্দেশ করা যায়। উদাহরণস্বরূপ, একটি বস্তু বাম থেকে ডানে চলমান একটি পথ ধরে বিচরণ করতে পারে, এই পথের একটি সুবিধাজনক বিন্দুকে যদি আমরা মূলবিন্দু ধরে নেই, তাহলে এই পথে বস্তুটির অবস্থান একটিমাত্র স্থানাঙ্ক দিয়ে প্রকাশ করা যায়। এক্ষেত্রে মূলবিন্দুর ডানদিকের অবস্থানসূচক স্থানাঙ্কগুলোর মান ধনাত্মক ও বামদিকের স্থানাঙ্কের মান ঋণাত্মক ধরা যায়। লক্ষণীয় যে, এক্ষেত্রে মূলবিন্দুর স্থানাঙ্ক হবে। বস্তুর অবস্থান যদি সময়ের ফাংশন হয়, তবে সময় থেকে গণনা শুরু করে সময়ের মধ্যে তার গড়বেগ[৪] এখানে ঐতিহ্যগতভাবে গ্রিক বর্ণ (ডেল্টা) ব্যবহৃত হয়েছে, যা কোনো "রাশির পরিবর্তন" নির্দেশ করতে ব্যবহৃত হয়। এক্ষেত্রে গড়বেগ ধনাত্মক বা ঋণাত্মক হতে পারে। ধনাত্বক গড়বেগের অর্থ হলো: আমাদের কাঙ্ক্ষিত সময় ব্যবধানে অবস্থান নির্দেশক স্থানাঙ্ক বৃদ্ধি পায়। (উপরের একমাত্রিক উদাহরণে, বস্তু ডানদিকে গমন করে) পক্ষান্তরে ঋণাত্মক গড়বেগ নির্দেশ করে যে স্থানাঙ্ক হ্রাস পেয়েছে; উদাহরণের ক্ষেত্রে বস্তুর বাম দিকে সরণ ঘটেছে। কিন্তু সমস্যা হলো গড়বেগ বস্তুর তাৎক্ষণিক বেগ (একটি নির্দিষ্ট মুহূর্তের বেগ) সম্পর্কে ধারণা দিতে পারে না। এক্ষেত্রে গণিতের উচ্চতর একটি শাখা, ক্যালকুলাস কাজে আসে।

ক্যালকুলাস গড় বেগ থেকে তাৎক্ষণিক বেগ নির্ধারণের পথ দেখায়। গড়বেগের পরিবর্তে ক্যালকুলাসের নিয়মে পাওয়া তাৎক্ষণিক বেগ নির্দেশ করতে, প্রতীকের পরিবর্তে ব্যবহার করা যায়। যেমন,এর দ্বারা বেগকে (তাৎক্ষণিক বেগ) "সময়ের সাপেক্ষে অবস্থানের অন্তরজ" হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়। গড়পড়তাভাবে বললে, এর অর্থ দাঁড়ায় "অতিক্ষুদ্র অতিক্রান্ত দূরত্ব ও যে অতিক্ষুদ্র সময় ব্যবধানে এ দূরত্ব অতিক্রান্ত হয়েছে - রাশিদ্বয়ের অনুপাত" (অন্যভাবে বললে, সময় ব্যবধান অত্যন্ত ক্ষুদ্র হলেই কেবল নির্দিষ্ট মুহূর্তের বেগ পাওয়া যায়)।[৫] তবে সুক্ষ্ণভাবে, এসকল অন্তরজকে সীমা (টেমপ্লেট:Lang-en)-এর সংজ্ঞার সাহায্যে সংজ্ঞায়িত করা হয়।[৪] মানের জন্য একটি ফাংশন এর সীমাস্থ মান হয়, যদি এর খুবই কাছাকাছি মানের জন্য ও এর মানের ব্যবধান যাদৃচ্ছিকভাবে ক্ষুদ্র (টেমপ্লেট:Lang-en) হয়। গাণিতিকভাবে একে লেখা হয়, সীমা ব্যবহার করে তাৎক্ষণিক বেগ-এর সংজ্ঞা দাঁড়ায়: "সময়ের ব্যবধান শূন্যে সঙ্কুচিত হলে গড় বেগের সীমাস্থ মান": বেগের পর আমরা ত্বরণকেও সংজ্ঞায়িত করতে পারি। অবস্থানের সাথে বেগের যা সম্পর্ক, বেগের সাথে ত্বরণের সম্পর্কও তা: ত্বরণ (টেমপ্লেট:Lang-en) হলো সময়ের সাপেক্ষে বেগের অন্তরজ।টেমপ্লেট:Refn একেও সীমার সাহায্যে সংজ্ঞায়িত করা যায়।ফলস্বরূপ, ত্বরণ হলো সময়ের সাপেক্ষে অবস্থানের দ্বিতীয় অন্তরজ (টেমপ্লেট:Lang-en)।[৫] তাই একে নিম্নরূপেও লেখা যায় .
অবস্থানকে যখন কোনও মূলবিন্দু থেকে স্থানচ্যুতি হিসাবে বিবেচনা করা হয়, তখন এটি একটি ভেক্টর: একটি বিশেষ ধরনের রাশি যার মাত্রা এবং দিক উভয়ই রয়েছে।[৬]টেমপ্লেট:Rp বেগ এবং ত্বরণও ভেক্টর রাশি। বস্তুর গতি কেবলমাত্র একটি সরলরেখা বরাবর সীমাবদ্ধ থাকবে, এমন নয়। বস্তু দ্বিমাত্রিক বা ত্রিমাত্রিক স্থানে বিচরণ করতে পারে, এবং গতি নির্দেশক রাশিগুলো (অবস্থান, বেগ বা ত্বরণ) একাধিক মাত্রায় প্রযোজ্য হতে পারে। ভেক্টর বীজগণিতের গাণিতিক কৌশলগুলো ব্যবহার করে দ্বিমাত্রিক ও ত্রিমাত্রিক স্থানে বস্তুর বিভিন্ন গতীয় রাশিকে বর্ণনা করা সম্ভব হয়। ভেক্টর রাশিকে উপরে ছোটো তীরচিহ্ন দিয়ে () বা মোটা হরফে () লেখা হয়। ভেক্টরের জ্যামিতিক রূপ হলো একটি তীর, এর দিক ভেক্টরের দিক নির্দেশ করে, এর দৈর্ঘ্য ভেক্টরের মান নির্ণয় করে।

সাংখ্যিকভাবে, একটি ভেক্টরকে একটি তালিকার মতো করে উপস্থাপন করা যেতে পারে: উদাহরণস্বরূপ, একটি বস্তুর বেগ ভেক্টর হতে পারে, যা নির্দেশ করে যে এটি অনুভূমিক অক্ষ বরাবর প্রতি সেকেন্ডে ৩ মিটার এবং উল্লম্ব অক্ষ বরাবর প্রতি সেকেন্ডে ৪ মিটার গতিতে চলছে। একটি ভিন্ন স্থানাঙ্ক ব্যবস্থায় একই বস্তুর গতিকে বর্ণনা করলে হয়তোবা ভিন্ন ভিন্ন সংখ্যামান পাওয়া যাবে, কিন্তু তা একই গতি নির্দেশ করে। উল্লেখ্য যে, একাধিক স্থানাঙ্ক ব্যবস্থার মধ্যে রূপান্তর ভেক্টর বীজগণিত ব্যবহার করে করা যায়।[৬]টেমপ্লেট:Rp

বলবিদ্যা অধ্যয়ন জটিলতর হয়ে ওঠার আরেকটি কারণ হলো শক্তির মতো ঘরোয়া শব্দগুলির পদার্থবিজ্ঞানে বিশেষ অর্থ আছে।[৭][৮] তাছাড়া কিছু পারিভাষিক শব্দ দৈনন্দিন কথাবার্তায় সমার্থক মনে হলেও পদার্থবিদ্যায় সমার্থক নয়। উদাহরণস্বরূপ বল (টেমপ্লেট:Lang-en), চাপ (টেমপ্লেট:Lang-en) এবং শক্তি (টেমপ্লেট:Lang-en) একই নয়, কিংবা ভর (টেমপ্লেট:Lang-en) এবং ওজন (টেমপ্লেট:Lang-en)-ও আলাদা অর্থ বহন করে।[৯][১০]টেমপ্লেট:Rp
পদার্থবিদ্যার বল ধারণাটি দৈনন্দিন জীবনের ধাক্কা বা টান বিষয়গুলোকে পরিমাণগত করে তোলে। নিউটনীয় বলবিদ্যায় বল প্রায়শই তার এবং সুতার টান, ঘর্ষণ, পেশীপ্রযুক্ত বল, মাধ্যাকর্ষণ ইত্যাদির কারণে হয়। সরণ, বেগ এবং ত্বরণের মতো বলও একটি ভেক্টর রাশি।
সূত্রসমূহ

প্রথম সূত্রটেমপ্লেট:Anchor

লাতিন ভাষায় লিখিত নিউটনের প্রথম সূত্রটির অনুবাদ এরূপ,
- প্রতিটি বস্তু এর স্থির অবস্থা অথবা সমবেগে সরল পথে গতিশীল অবস্থা বজায় রাখে, যতক্ষণ না এর এর উপর প্রযুক্ত বলের কারণে তা সেই অবস্থা পরিবর্তনে বাধ্য হয়।
Every object perseveres in its state of rest, or of uniform motion in a right line, except insofar as it is compelled to change that state by forces impressed thereon.টেমপ্লেট:Refn
নিউটনের প্রথম সূত্র জড়তা বা জাড্যতার নীতি সম্পর্কে ধারণা দেয়: স্থির বস্তু স্থির থাকতে চায় এবং গতিশীল বস্তুর স্বাভাবিক আচরণ হলো সমদ্রুতিতে সরলরেখায় চলা। একটি বস্তু গতির এ অবস্থা বজায় রাখে, কিন্তু বাহ্যিক বল প্রয়োগ একে বিঘ্নিত করতে পারে।
নিউটনের প্রথম সূত্রের আধুনিক ধারণা হলো, জড় প্রসঙ্গ কাঠামোতে কোনো পর্যবেক্ষকই অপর কোনও পর্যবেক্ষকের উপর প্রাধান্য পায় না। জড় পর্যবেক্ষক বা Inertial observer-এর এই ধারণাটি আমাদের দৈনন্দিন জীবনে গতির প্রভাব অনুভব না করার বিষয়টিকে পরিমাণগতভাবে ব্যাখ্যা করে। উদাহরণস্বরূপ, প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে থাকা একজন ব্যক্তি তার সামনে একটি চলমান ট্রেন দেখতে পান। তিনি একজন জড় পর্যবেক্ষক (Inertial observer)। যদি ট্রেনটি সরলরৈখিক পথে ঐ পর্যবেক্ষকের সাপেক্ষে একটি স্থির দ্রুতিতে চলে, সেক্ষেত্রে ট্রেনে বসে থাকা একজন যাত্রীও একজন জড় পর্যবেক্ষক; কাজেই তিনিও কোনো গতি অনুভব করেন না। নিউটনের প্রথম সূত্রে প্রকাশিত নীতিটি হলো, কোন জড় পর্যবেক্ষক "সত্যিই" চলমান এবং কোনটি "সত্যিই" স্থির তা বলার কোন উপায় নেই। একজন পর্যবেক্ষকের সাপেক্ষে কোনো বস্তু স্থির; আবার অপর কোনো পর্যবেক্ষকের সাপেক্ষে ঐ একই বস্তু সমদ্রুতিতে সরলরৈখিক পথে গতিশীল হতে পারে। এবং কোনও পরীক্ষণ দ্বারাই এই দুটি দৃষ্টিকোণের কোনোটিকে ঠিক বা ভুল প্রমাণ করা সম্ভব নয়। পরম স্থিতির কোনো অস্তিত্ব নেই, অর্থাৎ পরম স্থিতির কোনো মানদণ্ড তথা উদাহরণ নেই।[১১][১২]টেমপ্লেট:Rp[১৩]টেমপ্লেট:Rp নিউটন নিজে বিশ্বাস করতেন যে পরম স্থান এবং পরম কালের অস্তিত্ব রয়েছে, কিন্তু পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য স্থান বা কালের পরিমাপ মাত্রই আপেক্ষিক।[১৪]
দ্বিতীয় সূত্রটেমপ্লেট:Anchor
নিউটনের ভাষ্যমতে,
- কোনো বস্তুর গতির পরিবর্তন তার উপর প্রযুক্ত বলের সমানুপাতিক; এবং বল যেদিকে ক্রিয়া করে সেই সরলরেখা বরাবর গতির পরিবর্তন ঘটে।
The change of motion of an object is proportional to the force impressed; and is made in the direction of the straight line in which the force is impressed.[১২]টেমপ্লেট:Rp
"গতি" (টেমপ্লেট:Lang-en) [বা "গতির পরিমাণ" (টেমপ্লেট:Lang-en)] দ্বারা নিউটন যে রাশিটিকে বোঝাতে চেয়েছিলেন, আধুনিক ধারণায় একে ভরবেগ (টেমপ্লেট:Lang-en) বলা হয়। ভরবেগ কোনো বস্তুতে থাকা পদার্থের পরিমাণ (ভর), এর দ্রুতি এবং গতির দিকের উপর নির্ভর করে।[১৫] আধুনিক প্রতীকে, বস্তুর ভরবেগকে এর ভর ও বেগের গুণফল হিসেবে নিম্নরূপে লেখা হয়: এখানে তিনটি রাশিই সময়ের সাথে পরিবর্তিত হতে পারে। নিউটনের দ্বিতীয় সূত্রমতে, সময়ের সাপেক্ষে ভরবেগের অন্তরজ (টেমপ্লেট:Lang-en) বল নির্দেশ করে; আধুনিক প্রতীকে: যদি ভর সময়ের সাথে সাথে পরিবর্তিত না হয়, তবে এই অন্তরীকরণটি শুধুমাত্র বেগের উপর ক্রিয়া করে। যেহেতু বেগের সময়ের সাপেক্ষে অন্তরজ ত্বরণ নির্দেশ করে, ফলে বলের মান হয় ভর ও ত্বরণের গুণফল:[১৬] আবার ত্বরণ সময়ের সাপেক্ষে অবস্থানের দ্বিতীয় অন্তরজ, ফলে একে এভাবেও লেখা যায়

একটি বস্তুর উপর একাধিক বল ক্রিয়াশীল থাকলে বলগুলো ভেক্টর রাশির নিয়মে যোজিত হয়। তাই একটি বস্তুর উপর মোট বল পৃথক পৃথকভাবে বলের মাত্রা এবং দিক উভয়ের উপরই নির্ভর করে।[১৭]টেমপ্লেট:Rp যখন কোনও বস্তুর উপর মোট বল শূন্য হয়, তখন নিউটনের দ্বিতীয় সূত্র অনুসারে, বস্তুটির ত্বরণ ঘটে না এবং এই অবস্থাকে যান্ত্রিক সাম্যাবস্থা (Mechanical Equilibrium) বলা হয়। এই অবস্থায় বস্তুর অবস্থান সামান্য পরিবর্তন করলে বস্তুটি যদি সাম্যাবস্থার কাছেই থেকে যায়, তবে একে সুস্থিত সাম্যাবস্থা (Stable Equilibrium) বলে; অন্যথায় একে বলে অস্থিতিশীল (Unstable) সাম্যাবস্থা।[১২]টেমপ্লেট:Rp[১৭]টেমপ্লেট:Rp
কোনো বস্তুতে একাধিক বল ক্রিয়াশীল থাকলে সাধারণত ফ্রি বডি ডায়াগ্রাম নামক চিত্রায়ন পদ্ধতির সাহায্যে তা উপস্থাপন করা হয়। এই চিত্রে বাহ্যিক প্রভাবে প্রযুক্ত সবগুলো বল ও সংশ্লিষ্ট বস্তুটিকে চিত্রায়িত করা হয়।[১৮] উদাহরণস্বরূপ, আনত তলে রাখা ব্লকের ফ্রি বডি ডায়াগ্রাম-এ, ব্লকের উপর মহাকর্ষ বল, অভিলম্ব বল, ঘর্ষণ এবং সুতার টান চিত্রিত থাকতে পারে।টেমপ্লেট:Refn
নিউটনের দ্বিতীয় সূত্রকে কখনও কখনও বলের সংজ্ঞা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। অর্থাৎ, বল হলো সেই বাহ্যিক প্রভাব: কোনো জড় পর্যবেক্ষক যখন কোনও বস্তুকে ত্বরণ প্রাপ্ত হতে দেখেন তখন ঐ বস্তুর উপর তা বিদ্যমান থাকে। তবে "বল থাকলে ত্বরণ ঘটে, ত্বরণ থাকলে বল থাকে" এটি টটোলজি হিসেবে যথেষ্ট হলেও পরিমাণগতভাবে বিশ্লেষণের জন্য বলের সম্পর্কে আরও তথ্য জানা প্রয়োজন হয়, যেমন: নিউটনের সর্বজনীন মাধ্যাকর্ষণ সূত্র থেকে বলের মানের জন্য একটি সমীকরণ পাওয়া যেতে পারে। নিউটনের দ্বিতীয় সূত্রে এর জন্য এই ধরনের একটি মান বসানো হলে, আমরা এমন একটি সমীকরণ পেতে পারি যা বস্তুর গতি সম্পর্কে ভবিষ্যতবাণী করতে সক্ষম।টেমপ্লেট:Refn নিউটনের দ্বিতীয় সূত্রকে "পদার্থবিজ্ঞান গবেষণা কর্মসূচির নির্ধারক" হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। পদার্থবিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য প্রকৃতিতে বিদ্যমান বলগুলোকে চিহ্নিত করা ও এর সাহায্যে পদার্থের গাঠনিক উপাদানগুলোকে নথিভুক্ত করা।[১২]টেমপ্লেট:Rp[১৯]টেমপ্লেট:Rp
তৃতীয় সূত্রটেমপ্লেট:Anchor
নিউটন বলেন,
- প্রত্যেক ক্রিয়ার একটি সমান বিপরীতমুখী প্রতিক্রিয়া রয়েছে; বা, দুটি বস্তুর মধ্যে পারস্পরিক ক্রিয়াদ্বয় পরস্পর সমান, এবং বিপরীতমুখী।
To every action, there is always opposed an equal reaction; or, the mutual actions of two bodies upon each other are always equal, and directed to contrary parts.[১২]টেমপ্লেট:Rp

তৃতীয় সূত্রের অতি সরলীকৃত ব্যাখ্যা, যেমন "ক্রিয়ার সমান প্রতিক্রিয়া আছে" প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিভ্রান্তির সৃষ্টি করে থাকে। প্রকৃতপক্ষে "ক্রিয়া" এবং "প্রতিক্রিয়া" দুটি ভিন্ন বস্তুর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হয়। উদাহরণস্বরূপ, একটি টেবিলের উপর স্থির থাকা একটি বই বিবেচনা করা যাক। পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ বইটিকে আকর্ষণ করে (ক্রিয়া)। সেই "ক্রিয়া"র "প্রতিক্রিয়া" টেবিলের প্রতিক্রিয়া বল নয়, বরং বই কর্তৃক পৃথিবীকে আকর্ষণ বল।টেমপ্লেট:Refn
নিউটনের তৃতীয় সূত্রটি ভরবেগের সংরক্ষণশীলতা নীতির সাথে সম্পর্কিত, যা এই সূত্রের চেয়েও মৌলিক একটি বিষয়। ভরবেগের নিত্যতার নীতিটি সেসকল ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য, যেখানে নিউটনের দ্বিতীয় সূত্র অকার্যকর। উদাহরণস্বরূপ, পদার্থবিদ্যায় বস্তু বাদেও আলো, বলের ক্ষেত্র প্রভৃতিও ভরবেগ ধারণ করে (কোয়ান্টাম বলবিদ্যায় যেমনটি দেখা যায়) এবং তা সংরক্ষণশীলতার নীতিও মেনে চলে, তবে সেক্ষেত্রে ভরবেগকে (ভর ও বেগের গুণফল এর পরিবর্তে) নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়।টেমপ্লেট:Refn

নিউটনীয় বলবিদ্যায়, দুটি বস্তুর ভরবেগ যথাক্রমে এবং হলে, বস্তুদ্বয়ের মোট ভরবেগ ,এবং এর পরিবর্তনের হার হলো নিউটনের দ্বিতীয় সূত্র অনুসারে, প্রথম পদটি প্রথম বস্তুর উপর মোট বল নির্দেশ করে, এবং দ্বিতীয় পদটি নির্দেশ করে দ্বিতীয় বস্তুর উপর মোট বল। বস্তুদ্বয়কে যেহেতু বাইরের প্রভাব থেকে বিচ্ছিন্ন ধরে নেওয়া যায়, তার অর্থ হলো, প্রথম বস্তুর উপর প্রযুক্ত বল অবশ্যই দ্বিতীয় বস্তু কর্তৃক প্রযুক্ত হয়, এবং বিপরীতটিও সত্য। নিউটনের তৃতীয় সূত্র অনুসারে, এই বল দুটির মান সমান কিন্তু দিক বিপরীত, তাই যোগ করলে এগুলো বাতিল হয়ে যায় এবং ধ্রুব থাকে। বিপরীতভাবেও বলা যায়, যদি ধ্রুব হয় (ভরবেগের নিত্যতা নীতি অনুসারে), তাহলে সমীকরণমতে বলের মাত্রা সমান এবং দিক বিপরীত।
ইতিহাস
গ্রীক দার্শনিক এরিষ্টটল মনে করতেন যে, মহাবিশ্বে সকল বস্তুর প্রাকৃতিক অবস্থান রয়েছে: ভারী বস্তুসমূহ (যেমন- পাথর) পৃথিবীতে স্থির থাকতে চায়, হালকা বস্তুসমূহ (যেমন- ধোঁয়া) আকাশে উঠে স্থির হতে চায় এবং নক্ষত্রসমুহ স্বর্গে থাকতে চায়। তিনি আরও মনে করতেন যে, কোন বস্তু স্থির থাকলে এটি প্রাকৃতিক অবস্থানে থাকে এবং বস্তুটি সমবেগে চলার জন্য বাইরে থেকে বল প্রয়োগ করতে হয়, নাহলে এটি থেমে যায়। কিন্তু, গ্যালিলিও গ্যালিলেই পরবর্তীতে বুঝতে পারেন যে, বস্তুর বেগ পরিবর্তনের (এককথায় ত্বরণ) জন্য বল প্রয়োগ করতে হয় এবং সমবেগে চলার জন্য বল প্রয়োগ করতে হয় না। অন্যভাবে, বল ক্রিয়া না করলে সমবেগে চলমান বস্তু সমবেগে চলতে থাকে। নিউটনের প্রথম সূত্রটি মূলত গ্যালিলিওর সূত্রের পুনবিবরণ। তাই নিউটন প্রথম সূত্রটিতে গ্যালিলিওর অবদানের কথা উল্লেখ করেন।
গুরুত্ব এবং সীমাবদ্ধতা
২০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে, নিউটনের সূত্র সমুহ পরীক্ষা নিরীক্ষা করে সত্যতা যাচাই করা হচ্ছে। নিউটনের সূত্রসমূহ গাণিতিক ভাবে প্রমাণ করা যায়। দৈনন্দিন জীবনের বিভিন্ন ঘটনার ব্যাখ্যা দিতে খুবই কাজে লাগে।
নিউটনের প্রথম দুটি সূত্র এক ধরনের বিশেষ প্রসঙ্গ কাঠামোর ক্ষেত্রে সঠিক। এ ধরনের প্রসঙ্গ কাঠামোকে বলা হয় জড় প্রসঙ্গ কাঠামো। তৃতীয় সূত্রটি যেকোনো প্রসঙ্গ কাঠামোর ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। অনেক পদার্থবিদ মনে করেন, নিউটনের প্রথম সূত্র হল দ্বিতীয় সূত্রের বিশেষ রূপ যেখানে বল = ০।
নিউটনের তৃতীয় সূত্র দিয়ে মানুষ কেন হাঁটে তার ব্যাখ্যা দেওয়া যায়। চলন্ত সাইকেল কেন থেমে যায় তা ব্যাখ্যা করা যায় ২য় সূত্রের মাধ্যমে। তবে, আলোর বেগের কাছাকাছি বেগের বস্তুর ক্ষেত্রে, নিউটনের সূত্র সমূহ দিয়ে সেই বস্তুর গতি ব্যাখ্যা করা যায় না। এক্ষেত্রে আপেক্ষিকতা তত্ত্ব দিয়ে তা ব্যাখ্যা করতে হয়। আবার খুবই ছোট কণার ক্ষেত্রে নিউটনের সূত্র তেমন কাজের না। এক্ষেত্রে কণাবাদী বলবিদ্যা (কোয়ান্টাম বলবিদ্যা) দিয়ে তা ব্যাখ্যা করতে হয়।
পাদটীকা
তথ্যসূত্র
টেমপ্লেট:পদার্থবিজ্ঞানের শাখাসমূহ
- ↑ টেমপ্লেট:Cite book
- ↑ টেমপ্লেট:Cite book
- ↑ টেমপ্লেট:Cite book
- ↑ ৪.০ ৪.১ টেমপ্লেট:Cite book
- ↑ ৫.০ ৫.১ টেমপ্লেট:Cite book
- ↑ ৬.০ ৬.১ উদ্ধৃতি ত্রুটি:
<ref>ট্যাগ বৈধ নয়;:1নামের সূত্রটির জন্য কোন লেখা প্রদান করা হয়নি - ↑ টেমপ্লেট:Cite journal
- ↑ টেমপ্লেট:Cite journal
- ↑ টেমপ্লেট:Cite journal
- ↑ টেমপ্লেট:Cite book
- ↑ টেমপ্লেট:Cite book
- ↑ ১২.০ ১২.১ ১২.২ ১২.৩ ১২.৪ উদ্ধৃতি ত্রুটি:
<ref>ট্যাগ বৈধ নয়;:0নামের সূত্রটির জন্য কোন লেখা প্রদান করা হয়নি - ↑ উদ্ধৃতি ত্রুটি:
<ref>ট্যাগ বৈধ নয়;:2নামের সূত্রটির জন্য কোন লেখা প্রদান করা হয়নি - ↑ টেমপ্লেট:Cite journal
- ↑ টেমপ্লেট:Cite book
- ↑ টেমপ্লেট:Cite book
- ↑ ১৭.০ ১৭.১ উদ্ধৃতি ত্রুটি:
<ref>ট্যাগ বৈধ নয়;Kleppnerনামের সূত্রটির জন্য কোন লেখা প্রদান করা হয়নি - ↑ টেমপ্লেট:Cite journal
- ↑ উদ্ধৃতি ত্রুটি:
<ref>ট্যাগ বৈধ নয়;FLSনামের সূত্রটির জন্য কোন লেখা প্রদান করা হয়নি